Sunday, May 17, 2015

বাংলা ভাষায় কিছু ভালো ইসলামিক ওয়েবসাই(আপডেটসহ)

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম



আমার ওয়েবসাইট সিরিজের একটি উদ্দেশ্য ছিল ‘স্কলারদের কাছ থেকে শিখা’, ভালো লেখক যারা, যে বিষয়গুলো নিয়ে লিখেছেন, সে বিষয়গুলো সম্পর্কে জানা।

বিশেষত যে সব বিষয়গুলো শরিয়ার জ্ঞানের সাথে সরারসরি সম্পর্কযুক্ত, ইসলামের একাডেমিক বিষয়, সেগুলো স্কলার ছাড়া সাধারণ অনলাইন/ফেইসবুক/বা ব্লগের লেখকদের কাছ থেকে না নেওয়া।

ওয়েবসাইটসমূহ

1. কুর’আনের আলো
http://www.quraneralo.com/

2. সঞ্চারণ
http://www.shoncharon.com

3. আহবান
http://ahobaan.com/

4. সদালাপ
http://www.shodalap.org/

5. কুরআনের কথা
http://quranerkotha.com/

6. স্কলারদের ইসলামিক উক্তি – আলোকিত শান্তির বাণী
http://islamicquotesbangla.com/

7. নুমান আলী খান বাংলা
http://www.nakbangla.com

8. সমকালীন
http://shomokalin.com/

9. হাদীস বিডি
http://www.hadithbd.com

10. সমাজ ও সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র
http://www.cscsbd.com

11. ইসলাম
http://www.islam.net.bd/

12. ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ
http://www.imbdblog.com

13. জুমার খুৎবা
http://jumarkhutba.com/updatesite/

14. আই হাদীস
http://www.ihadis.com/

15. সুন্নাহ ট্রাস্ট
http://assunnahtrust.com/

16. সরল পথ
http://www.shorolpoth.com

17. জান্নাতের পথে
http://www.waytojannah.com

18. উন্মুক্ত ইসলাম শিক্ষা কার্যক্রম
http://www.oiep.net

19. ইসলামঃ প্রশ্ন ও উত্তর
http://islamqa.info/bn/

20. Collected Notes and Discussion
http://www.collectednotes.net/

21. সত্যের পথ
http://www.sotterpath.com/

22. ইবানা
http://www.ibanaway.com

23. গ্লোবাল মিম্বার
http://www.globalminberbangla.com

24. ইসলামিক আলো
http://www.islamicalo.com/

25. ইসলামকি লাইফ
http://www.islaminlife.com/bn/

26. ইসলাম হাউস
http://islamhouse.com/bn/main/

ব্লগস্পট ও ওয়ার্ডপ্রেস সাইট
1. http://alorpothe.wordpress.com/

2. http://deenweekly.wordpress.com/
3. http://alsabanow.blogspot.com/
4. http://riyadussoliheen.wordpress.com/
5. http://sorolpath.wordpress.com/
6. http://shorolpoth.wordpress.com/
7. http://salafibd.wordpress.com/
8. http://idream4life.blogspot.com/
9. http://dampotto.blogspot.com/
10. http://learningdeen.wordpress.com/
11. http://thesafwanism.blogspot.com/
12. http://imbd.blog.com/?p=893
13. http://nusrat807.blogspot.com/
14. http://dream4newday.blogspot.com/
15. http://ummu-abdullah.blogspot.com/
16. http://enlightenedtalks.blogspot.com/
17. http://words-of-scholars.blogspot.com/
18. http://islamicbanglabd.blogspot.com/
19. http://quranbangla.weebly.com/index.html
20. http://sciencewithquran.wordpress.com/
21. http://islamerahban.wordpress.com/
22. https://meherdadahmed.wordpress.com/
23. http://www.blog.omaralzabir.com
24. http://www.amarspondon.wordpress.com
25. http://www.learningfrommylife.wordpress.com
26. http://www.onunadonukhon.blogspot.com
27. http://www.quickestwaytoquran.blogspot.com

ইসলাম সম্পর্কে আমরা যেসব সমস্যাগুলো দেখি সেগুলো আজকের দিনে বেশিরভাগ এই স্কলারদের থেকে না নেওয়ার কারণেই হয়ছে। কিছু ইজতিহাদি বিষয় রয়েছে সেগুলোতে ‘মতভিন্নতা’/‘দ্বিমত/বহুমত’(ঝগড়া নয় অবশ্যই) থাকতেই পারে কিন্তু যেসব বিষয় ইজতিহাদি নয় সেগুলোতেও আমরা প্রচন্ড পরিমাণ ঝগড়ার প্রদর্শন দেখি অনলাইনে(ইসলাম করতে গিয়ে পাপই বেড়ে যাচ্ছে !)। এর কারণ ওইসব লেখক/লেখিকারা মূলত ইসলামের এমন সব বিষয়ে গিয়েছে যেগুলোতে তাদের একাডেমিক জ্ঞান নেই বা তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে অন্য মুসলিম বা যারা ইসলাম পালন করে তাদের সাথে ঘটে যাওয়া তিক্ত অভিজ্ঞতাকে ইসলামের সাথে মিশিয়ে চালিয়ে দিয়েছেন। আবার অনেকেই ইসলামের ব্যাসিক জ্ঞান না নিয়ে শুধুমাত্র পশ্চিমা স্ককলারদের জিওগ্রাফিকাল অবস্থানকে ইসলামের অবস্থান বলে চালিয়ে দিয়েছে।

তাই এখানে সামাজিক যোগাযোগ বা ব্লগ থেকে ইসলাম না শিখে সত্যিকারভাবে স্কলারদের লেখা থেকে ইসলাম শেখার জন্য এই সাইটগুলো সংগ্রহ-ই আমার উদ্দেশ্য। আমি আবারো বলছি…এইসব সাইটগুলো আমার দেখা মতে ভালো…তবে একদম একাডেমিক বিষয়গুলোও এই সাইটগুলোতে কোন স্কলার/আলেম ছাড়া লেখে সেগুলোকেও আমি নিতে বলি না…সেগুলো সম্পর্কেও স্কলারদের লেখা খুজলে পাওয়া যাবে এবং তাদের থেকেই নেওয়া উচিৎ- কেননা স্কলারদের ইসলাম সম্পর্কে, এর চাতুর্মুখিক বিষয়সমূহ সম্পর্কে ও প্রচুর রিসোর্সের জ্ঞান থেকে ব্যালান্স করে দিয়ে থাকেন – যা আমাদের মত কয়েকটা বই পড়ুয়াদের জন্য অসম্ভব।

সোর্স - https://alsabanow.wordpress.com/

Wednesday, May 13, 2015

রসূল(সাঃ) জীবিত,নাকি মৃত ??

আল্লাহ তায়ালা বলেন প্রত্যেকটি প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করতে হবে। তিনি আরও বলেন-সব কিছুই নশ্বর, অবিনশ্বর কেবল আল্লাহর সত্ত্বা। হাদীস থেকে আমরা জেনেছি, শেষ পর্যন্ত মালাকুল মউত জীবিত থাকবে এবং তাকেও মৃত্যুবরণ করতে হবে। এটিই আল্লাহর অহংকার,যে তিনিই থাকবেন,তিনিই স্থায়ী,অবিনশ্বর,অনাদী,অনন্ত,অক্ষয়।

- তুমি (রাসুল) তো মরনশীল এবং তারাও (অন্য মানুষ) মরণশীল [সুরা যুমার - ৩০]

- ভুপৃষ্ঠে যা কিছু আছে সবই নশ্বর (মরণশীল) [সুরা আর রাহমান - ২৬]

- আমি তোমার পুর্বেও কোন মানুষকে অনন্ত জীবন দান করিনি (পরেও করিনি)। অর্থাৎ তোমার মৃত্যু হলে তারা কি চীরজীবি থাকবে? [সুরা আম্বিয়া- ৩৪]

সহিহ হাদীস থেকে আমরা জেনেছি মানুষ মারা গেলে বারযাখ নামক একটি স্থানে চলে যায়। এর দুটি অংশ আছে একটি ইল্লিয়িন,অপরটি সিজ্জিন। ইল্লিয়িন এমন স্থান যেখানে নেককার মানুষেরা থাকে। সহিহ হাদীসে এটাও বর্ণিত হয়েছে সে স্থানটির সাথে জান্নাতের সংযোগ স্থাপিত হবে,তারা সেখানে ঘুমিয়ে থাকবে। এবং যখন হাশরের দিনে তাদেরকে ডেকে দেওয়া হবে, তারা উঠে বলবে আমরা একদিন অথবা আরও কিছুটা বেশী সময় ধরে ঘুমিয়েছিলাম। অপরদিকে সিজ্জিনে পাপী বান্দাদের শাস্তি প্রদান করা হবে। হাশরে সকলেই উঠবে এবং বিচার হবে,এরপর জান্নাত ও জাহান্নাম নির্ধারিত হবে।

এ পর্যন্ত যা বললাম তার ব্যাপারে সকল তাওহিদপন্থী একমত হবেন। কিন্তু এর ভেতরদিয়েই ব্যাখ্যা বিশ্লেষনগত কিছু বিষয়ে আলিমদের মধ্যে মত দ্বৈততা রয়েছে,যা অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে নবী ও শহীদদের কবর জীবনের ব্যাপারে এই মতদ্বৈততা সৃষ্টি হয়েছে। আমি এমন একটি অবস্থান থেকে বিষয়টি উপস্থাপন করতে চাই যেটা চিন্তাশীলদের চিন্তায় সহায়ক হতে পারে। আমার পক্ষ থেকে সকল ভুলের কারনে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

==============================

প্রশ্ন হল রসূল(সাঃ)কবরে জিবীত আছেন নাকি তিনি মৃত ?

যেহেতু রসূল(সাঃ) মানুষ ছিলেন আর ইতিহাস থেকে জানি তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন ,তাই অবশ্যই তিনি মৃত । তবে যারা এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলছেন,তারা তার(সাঃ)মৃত্যুর পরবর্তী অবস্থার চিত্রটি নিয়ে মত দ্বৈততায় জড়িয়েছেন। তারা বলছেন সকল ভালো মানুষ ইল্লিয়িনে ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে কিন্তু শহীদরা তেমনটি থাকেন না। তারা জেগে থাকেন এবং তারা নিয়ামত উপভোগ করেন। এ প্রসঙ্গে কুরআনের আয়াত ও হাদীসও পেশ করা হয়েছে। আর এখান থেকে এভাবে সিদ্ধান্তে আসা হয়েছে যে,যেহেতু শহীদরা জিবীত থাকেন তা প্রমানিত,তাই শহীদদের থেকেও অনেক বেশী সম্মানিত নবীগণ অবশ্যই জিবিত।

আসুন আমরা এ সংক্রান্ত বিষয়ে কিছু সূত্র জেনে নেই:

- এবং যারা হিজরত করেছে আল্লাহর পথে, অতপর নিহত হয়েছে অথবা মারা গেছে তাদেরকে আল্লাহ অবশ্যই উৎকৃস্ট জীবিকা দান করবেন। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বোৎকৃস্ট রিজিকদাতা। [সুরা হজ্জ - ৫৮]

- যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাহাদেরকে কখনই মৃত মনে করো না, বরং তাহারা জীবিত এবং তাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে তারা জীবিকা প্রাপ্ত। [সুরা ইমরান - ১৬৯]

এবং যারা হিজরত করেছে আল্লাহর পথে, অতপর নিহত হয়েছে অথবা মারা গেছে তাদেরকে আল্লাহ অবশ্যই উৎকৃস্ট জীবিকা দান করবেন। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বোৎকৃস্ট রিজিকদাতা। তিনি (আল্লাহ) তাহাদেরকে অবশ্যই এমন স্থানে দাখিল করবেন যা তারা পছন্দ করবে এবং আল্লাহ সম্যক প্রজ্ঞাময়, পরম সহনশীল। (সুরা হজ্জ এর আয়াত ৫৮,৫৯ )

লক্ষ্য করুন, এখানে যদিও বলা আছে মৃত্যুর পরে জীবিকা দেওয়া হবে। কিন্তু সেই সাথে কিন্তু এটাও বলা আছে তাহাদেরকে "এমন এক স্থানে" দাখিল করবেন। অর্থাৎ আমাদের দেখা চেনা জানা ভুবন নয়, অন্য কোন ভুবন। (দুনিয়াতে নয়)

এখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে শহীদদেরকে যে রিজিক প্রদানের কথা হচ্ছে তার অর্থ যদি এই হয় তারা ৫/৬ফুট লম্বা কবরে শুয়ে সেটা উপভোগ করছেন,তাহলে কবর খুড়ে দেখলে তা প্রমানিত হওয়ার কথা। এখানে মৃত্যুর পর যে জগতে আত্মা প্রবেশ করে,সেই অপরিচিত জগৎকেই কবর বলা হয়। সেটা ইল্লিয়িন অথবা সিজ্জিন। সেটা হল বারযাখ বা পর্দা,যার ওপাশে আছে হাশরের অবস্থা। যখন চূড়ান্ড সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

অতএব শহীদরা যদি মৃত্যুর পর রিজিক পেয়ে থাকেন, সেটা ইল্লিয়িনের অবস্থায়,যার সাথে জান্নাতের সংযোগ রয়েছে। আর নবীদের অবস্থার ব্যাপারে শহীদদের বিষয়ে অবতীর্ণ আয়াত ও বর্ণিত হাদীসটি তাদের ক্ষেত্রে গ্রহন করলেও বলতে হয়,যেখানে নবীদেরকে দাফন করা হয়েছে বা কবরস্ত করা হয়েছে সে স্থানটি আমাদের দৃষ্টিতে কবর হলেও ঘটনা সেখানে ঘটেনা। ঘটনা এমন একটি স্থানে ঘটে যেটি শুধু আল্লাহই জানেন। তবে মানুষকে আল্লাহ সৎ পথে পরিচালিত করার জন্যে কখনও নিদর্শন দেখান। তার জন্যে এই কবরসমূহে কিছু নিদর্শন প্রকাশিত হয় আমাদের বোঝার জন্যে। যেমন: কখনও কখনও কিছু শহীদদের দেহ দীর্ঘ সময় পরও অবিকৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। আবার কখনও কখনও কোনো কবর থেকে শাস্তির নিদর্শনও প্রত্যক্ষ করা গেছে। যেমন সহী বুখারীর বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে আল্লাহর রসূল(সাঃ) একটি কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ তার উটটি লাফ দিয়ে বসে পড়ে। তিনি তখন জানতে চান কার কবর,তাকে জানানো হয়। তিনি বলেন এই কবরবাসীর শাস্তি হচ্ছে একটি সাধারণ কারনে,তা হল সে প্রস্রাব থেকে পবিত্র হত না। এরপর তিনি একটি খেজুরের ডাল কবরে পুতে দিয়ে বলেন,যতদিন এটি না শুকাচ্ছে,তার কবরের শাস্তি লাঘব হবে আশা করা যায়....

এ হাদীস থেকে বোঝা যায়, শাস্তি দাফন করা এই কবরেই হয়। কিন্তু এটা যদি এভাবে সত্য হয়,তাহলে প্রত্যেক কবরের ক্ষেত্রে বিষয়টি বুঝতে পারার কথা,অথবা উটেরা বুঝতে পারবে। তবে আমি এটাও প্রমান করতে চাচ্ছি না যে, ঘটনা এই মাটির কবরে ঘটেনা। বরং আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাচ্ছি-কিছু বিষয়ে আমাদের স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি,কারন সেটা জানানো প্রয়োজনও নেই,অথবা জানালেও আমরা সঠিকভাবে বুঝতে সক্ষম হবনা । আমরা কিছু বিষয়ে জানিনা,এটাই সত্য। শুধু শুধু জ্ঞান জাহির করতে অতিরিক্ত কচলাকচলি না করাই কল্যানকর।

হতে পারে সকল ঘটনা এই কবরেই ঘটে কিন্তু কি রূপে ঘটে সেটি আমাদের অজানা। পূনরুত্থান সম্পর্কিত হাদীস থেকে বোঝা যায়,মানুষ হাশরের মাঠে এসকল কবরস্থান থেকে উত্থিত হয়ে অগ্রসর হবে। এবং সহি হাদীস থেকে এটাও জানা যায়, হাশর হবে এই পৃথিবীতেই। এটাকে সমান ময়দানে পরিনত করা হবে।

“ওহুদের যুদ্ধে শহীদগণ অফুরন্ত নেয়ামত পাবার পর জান্নাতুল ফেরদাউস থেকে তারা বললেন........‘এরুপ কেউ কি আছে,যে দুনিয়াতে আমাদের ভাইদের কাছে সু-সংবাদ পৌঁছে দিবে,আমরা জান্নাতে কিভাবে জীবন যাপন করছি এবং এখানে আমাদেরকে কত উৎকৃষ্ট জীবিকা দান করা হয়েছে,যাতে মানুষেরা কখনই জিহাদে শিথিলতা প্রদর্শন না করে ? অতঃপর মহান আল্লাহ তায়ালা বললেন-‘আমি তাদের কাছে তোমাদের পক্ষ হতে এ সংবাদ পৌঁছে দেব।”(হাদীসে কুদ্সী)(রসূল সাঃ এর মাধ্যমে আল্লাহ আমাদেরকে তা জানিয়ে দিয়েছেন।)

মুসলিম শরীফে বর্ণিত একটি হাদীসে শহীদদের ব্যাপারে বলা হচ্ছে-তাদের রুহকে একটি সবুজ রঙের পাখির মধ্যে ফুকে দেওয়া হয় এবং তারা জান্নাতের সর্বত্র বিচরণ করতে পারে।

এখানে প্রশ্ন আসতে পারে, হাশরের আগেই কিভাবে শহীদরা জান্নাতে গেল ? আরও প্রশ্ন আসতে পারে চলমান পৃতিবীর মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময়ের মধ্যে রসূল(সাঃ) মিরাজে গিয়ে এতসব কাজ কিভাবে করলেন ? এরকম আরও কিছু সময় সংক্রান্ত জটিল বিষয় রয়েছে,যা আমরা জ্ঞানের স্বল্পতার কারনে বুঝতে অক্ষম। মূলত: এসকল বিষয়ের জ্ঞান শুধু আল্লাহর রয়েছে। যে বিষয় বা স্থানসমূহ সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, তা কোনো মানুষ দেখেনি,কল্পনাও করেনি,সেসব বিষয় সম্পর্কে মানুষের কল্পনা,চিন্তা ভুল হওয়ার গ্যারান্টি আল্লাহই দিচ্ছেন। কারন সেটা মানুষের কল্পনার বাইরের বিষয়। আমরা এসকল বিষয় থেকে কোনো কিছু উপলব্ধী করতে পারি,কিন্তু এসব বিষয়ে বিতর্ক কোনো কল্যান বহন করেনা। শুধু বিশ্বাস করতে হবে।

আসুন আমরা আরও কিছু রেফারেন্স দেখী:

আবূ বকর (রাঃ) মদীনার উপকন্ঠের তাঁর বাড়ি থেকে মসজিদে নববীতে এসে উম্মুল মু’মিনীন আয়িশার (রাঃ) ঘরে রসূলুল্লাহকে (সঃ) দেখতে গেলেন। তিনি রসূলুল্লাহর কপালে চুমু খেয়ে বলেছিলেন, “আল্লাহর ক্বসম, আপনি দু’বার মৃত্যু বরণ করবেন না। আপনার জন্য আল্লাহ যে মৃত্যু নির্ধারিত করে রেখেছিলেন তার স্বাদ আপনি আস্বাদন করেছেন।”(বুখারী-কিতাবুল মাগাজী)

এরপর তিনি বেরিয়ে এসে আল্লাহর হামদ ও সানা দিয়ে বক্তৃতা শুরু করলে জনতা তাঁর পাশে এসে জমায়েত হয়। তিনি বললেন, “যে মুহাম্মদের ইবাদত করত তার জানা উচিৎ তিনি মরে গেছেন; আর যে আল্লাহর ইবাদত করে তার জানা উচিৎ আল্লাহ চিরঞ্জীব, তিনি মারা যান না।”(বুখারী-কিতাবুল মাগাজী)

এরপর তিনি পড়লেন, “মুহাম্মদ একজন রসূল ছাড়া আর কিছুই ছিলেন না। তাঁর আগেও অনেক রসূল গত হয়েছেন। এখন যদি তিনি মারা যান অথবা নিহত হন তাহলে কি তোমরা [তোমাদের দীন থেকে] পেছনে ফিরে যাবে? আর যে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে সে আল্লাহর কোন ক্ষতিই করতে পারবে না। আর আল্লাহ শোকরকারীদের পুরস্কৃত করবেন।”(আল-কুরআন, ৩:১৪৪)

রসূলুল্লাহ্‌ (সঃ) মারা গেছেন। তিনি মারা যেতে পারেন, যেমন তাঁর আগের রসূলরা মারা গেছেন। আল্লাহ তাঁর রসূলের মৃত্যুর নিশ্চয়তা দিয়ে আয়াত নাজ়িল করেছেন। “নিশ্চয় তোমারও মৃত্যু হবে এবং তাদেরও মৃত্যু হবে। তারপর কিয়ামতের দিনে নিশ্চয়ই তোমাদের প্রভুর সামনে তোমরা একে-অন্যে বিতর্কে লিপ্ত হবে।” (আল-কুরআন, ৩৯:৩০-৩২)

অর্থাৎ রসূল(সাঃ) এর ওফাত হয়েছে। তিনি আমাদের মাঝে কোনোভাবেই ,কোনো রূপেই উপস্থিত নেই।

=======================

এবার আমরা আরও কিছু রেফারেন্স দেখব:

“আল্লাহর পথে যারা নিহত (শহীদ) হয়, তোমরা তাদেরকে মৃত বলো না। বরং তারা জীবিত। তবে তা তোমরা উপলব্ধি করতে পারো না।”

(সূরাহ বাকারা, আয়াত নং ১৫৪)

“যারা আল্লাহর পথে নিহত (শহীদ) হয়েছে, তোমরা তাদেরকে মৃত জ্ঞান করো না। বরং তারা জীবিত; তাদের রব-প্রতিপালকের নিকট থেকে তারা রিযিকপ্রাপ্ত হয়।”

(সূরাহ আলে ইমরান, আয়াত নং ১৬৯)

শহীদগণ আলমে বরযাখে কিভাবে জীবিত অবস্হায় জীবন অতিবাহিত করেন এবং রিযিক লাভ করেন, সে সম্পর্কে হাদীস শরীফে রয়েছে--

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন--

“শহীদগণের রূহ সবুজ রঙের পাখির পেটের ভিতরে বিশেষ সম্মানিত অবয়বে অনন্য জীবন লাভ করে। আর তাদের জন্য আরশে প্রদীপসমূহ লটকানো হয়। তারা জান্নাতে যেখানে খুশী বিচরণ করেন।”

(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮৮৭)

শহীদগণ আলমে বরযাখে রিযিক কীভাবে লাভ করেন-এ সম্পর্কে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন--

“শহীদগণ জান্নাতের দ্বারে নির্ঝরণীর ঝলকে সবুজ গম্বুজের মধ্যে অবস্হান করেন। তখন জান্নাত থেকে সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের নিকট রিযিক আগমন করে।”

(মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২৩৮৬)

অপরদিকে সাধারণ মুমিনগণের রূহ সম্পর্কে হযরত কা‘ব ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন--

“মুমিনের রূহ পাখিরূপে জান্নাতের গাছে বিচরণ করে--যে পর্যন্ত কিয়ামতে তার দেহে তাকে ফেরানো না হয়।”

(মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৫৩৫১)

সুতরাং এক্ষেত্রে শহীদগণের রূহ তারকার ন্যায়-যা সবুজ পাখির ভিতর প্রবেশ করে। পক্ষান্তরে সাধারণ মুমিনগণের রূহ স্বয়ং পাখির স্বরূপ হয়ে যায়।

(তাফসীরে ইবনে কাসীর, ২য় খণ্ড, ১৬৪ পৃষ্ঠা)

=============================

নবীগণের কবরে জীবিত থাকা প্রসঙ্গে সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যাগ্রন্হ ফাতহুল বারীতে আল্লামা ইবনে হাজর আসক্বালানী (রহ.) তার অভিমত ব্যক্ত করেন-

“নবীগণ মহান আল্লাহর নিকট জীবিত, যদিও তারা দুনিয়াবাসীদের দিক দিয়ে মৃতের রূপে আছেন, কার-, প্রমাণিত আছে যে, শহীদগণ আল্লাহর নিকট জীবিত; আর নবীগণ নিঃসন্দেহে শহীদগণের চেয়ে অধিক মর্যাদাবান।”

(ফাতহুল বারী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৪৪৪ পৃষ্ঠা)

হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন--

“নিশ্চয়ই নবীগণ কবরে জীবিত; তারা নামায পড়েন।”

(বাইহাক্বী-হায়াতুল আম্বিয়া, ১৫ খণ্ড, ১৪৮ পৃষ্ঠা/ মুসনাদে বাযযার, হাদীস নং ৬৩৯১/ মুসনাদে আবী ইয়া‘লা, হাদীস নং ৩৪২৫ প্রভৃতি)

রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন--

“ যে রাতে আমাকে মি’রাজে নেয়া হলো; মূসা (আ.)-এর নিকট এলাম এমতাবস্হায় যে, তিনি লাল বালুকাস্তুপের নিকট স্বীয় কবরে দাঁড়িয়ে নামায পড়ছিলেন।”

(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৯৮১/ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১২৫০৪/ সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং ১৬৩১)

এ হাদীস উল্লেখ করার পর আল্লামা কুরতুবী (রহ.) অভিমত ব্যক্ত করেন--

“এ হাদীসের দ্বারা বাহ্যতভাবে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত মূসা (আ.)কে বাস্তবেই জাগ্রত অবস্হায়ই দেখেছেন এবং মূসা (আ.) কবরে জীবিত ছিলেন, তিনি সেখানে সেই নামাযই পড়ছিলেন-যা তিনি জীবদ্দশায় পড়তেন। এ সবই সম্ভব, এর কোন কিছুতে অবাস্তবতা নেই। আর বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, শহীদগণ জীবিত এবং তারা রিযিকপ্রাপ্ত হন, আর তাদের অনেককে এমন অবস্হায় পাওয়া গিয়েছে যে, অনেক বছর অতিক্রান্ত হলেও স্বীয় কবরের মধ্যে তাঁরা কোনরূপ পরিবর্তন হননি। তারা সম্পূর্ণ অবিকৃতরূপে আছেন। সুতরাং যখন শহীদগণের অবস্হা এই, তখনতো নবীগণের অবস্হা আরো উন্নত ও উত্তম হবে!” (আল-মুফহিম, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ১৯২ পৃষ্ঠা)

তেমনি রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত ঈসা (আ.) ও হযরত ইবরাহীম (আ.)কে এ অবস্হায় দেখেছেন যে, তারা নামায পড়ছেন বলে অপর রিওয়ায়াতে রয়েছে। (দ্রষ্টব্য : সহীহ মুসলিম, ২য় খণ্ড, ২৬৮ পৃষ্ঠা)

উল্লিখিত হাদীসসমূহে নবীগণের ওফাতের পর কবরে যে নামায পড়ার কথা বর্ণিত হয়েছে, এটা দুনিয়াতে তাঁদের প্রতি আরোপিত তাকলীফী নামায নয়, বরং এটা কবরে তাঁদের বিশেষ মর্যাদার পরিচায়ক তাশরীফী নামায। তাঁরা কবরে সশরীরে জীবিত হওয়ার পর এ নামাযের মাধ্যমে মহান আল্লাহর গুণকীর্তন করেন-যেমন ফেরেশতাগণ মুকাল্লাফ না হওয়া সত্ত্বেও মহান আল্লাহর বিভিন্ন ইবাদত পালনের দ্বারা তাঁর গুণকীর্তন করেন। নবীগণ কবরে গমনের পর কখন এ তাশরীফী নামায আদায়ের সম্মান লাভ করেন, সে সম্পর্কে হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন--

“নবীগণ তাঁদের কবরে চল্লিশদিন অতিবাহিত হওয়ার পর নিবৃত্ত থাকেন না এ ছাড়া যে, তারা মহান আল্লাহর সমীপে নামায পড়তে থাকেন। আর তা অব্যাহত থাকবে যাবত (কিয়ামতের জন্য) শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হয়।”

(মুসনাদে আবু ইয়া‘লা, হাদীস নং ৩৪২৮/ মুসনাদে বায্‌যার, হাদীস নং ৬৩৯৬/ মাজমাউয যাওয়ায়িদ, ৪র্থ খণ্ড, ২১১ পৃষ্ঠা)

অপরদিকে আলমে বরযাখে শহীদগণকে রিযিক প্রদান করা হয় মর্মে যেমন পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, তেমনি আলমে বরযাখে নবীগণকে রিযিক প্রদান করা হয় মর্মে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে। অধিকন্তু তাঁদের শরীর কবরে অক্ষত থাকে বলে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। এসবই কবরে(আলমে বারযাখে) তাঁদের সশরীরে জীবিত থাকার প্রমাণ বহন করে। এ প্রসঙ্গে হযরত আবু দারদা (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন--

“আল্লাহ তা‘আলা যমিনের উপর হারাম করে দিয়েছেন যে, নবীগণের শরীর খাবে। তাই আল্লাহর নবী মাত্রই জীবিত এবং রিযিকপ্রাপ্ত হন।”

(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১৬৩৭)

এ সকল হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হলো--নবী ও রাসূলগণ কবরে(আলমে বারযাখে) সশরীরে জীবিত আছেন; তারা রিযিকপ্রাপ্ত হন এবং নামায পড়েন(এই নামায পৃথিবীবাসীর মত এমন দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে আদায়কৃত নামায নয়)।

এ ছাড়াও মি‘রাজের ঘটনার হাদীস শরীফে অনেক নবীর কথা এসেছে যে, তাঁদের সাথে আসমানে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দেখা-সাক্ষাত ও সালাম-কালাম হয়েছে এবং মূসা (আ.) উম্মতে মুহাম্মদীর উপর আরোপিত ৫০ ওয়াক্ত নামায কমিয়ে আনতে রাসূলুল্লাহ (সা.)কে পর্যায়ক্রমে কয়েকবার পরামর্শ দেন। যার বদৌলতে পরিশেষে ৪৫ ওয়াক্ত কমিয়ে ৫ ওয়াক্ত নামায ফরজরূপে বলবৎ করা হয়। আবার সকল নবী ও রাসূল (আ.) বাইতুল মুকাদ্দাসে তাশরীফ এনে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইমামতীতে নামায আদায় করেন।

(দ্রষ্টব্য : সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৬১৪)

এসব ঘটনা নবীগণের (আ.) সশরীরে জীবিত থাকাকে অকাট্যভাবে প্রমাণ করে। সুতরাং সকল মুসলমানের এ আকীদা-বিশ্বাস রাখা কর্তব্য।

তবে নবীগণ কবরে সশরীরে জীবিত-এটা যেমন অকাট্যভাবে প্রমাণিত, তেমনি দুনিয়া থেকে তাঁরা ওফাত পেয়েছেন-একথাও সত্য এবং এর ওপরও ঈমান রাখতে হবে। যেমন, মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন--

“মুহাম্মদ (সাা.)তো একজন রাসূলই, আর তার পূর্বে বহু রাসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন।”

(সূরাহ আলে ইমরান, আয়াত নং ১৪৪)

অপর আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন--

“(হে নবী!) নিশ্চয়ই আপনারও মৃত্যু হবে এবং তাদেরও মৃত্যু হবে।”

(সূরাহ যুমার, আয়াত নং ৩০)

সুতরাং একদিকে যেমনিভাবে নবীগণের ইন্তিকাল বা ওফাতের ওপর ঈমান রাখা অপরিহার্য, তেমনি এর সাথে সাথে এ ঈমান পোষণ করাও কর্তব্য যে, নবীগণ বরযাখী জগতে বা কবরে সশরীরে জীবিত আছেন এবং তাঁরা তাঁদের সেই বারযাখী জীবনে জীবিত মানুষের ন্যায় বিশেষ বৈশিষ্ট্য লাভ করছেন-যা অপর সাধারণ মৃত ব্যক্তির নেই।

==========================

হযরত আবুদ দারদা’ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন--“তোমরা জুমু‘আর দিনে বেশী করে দরূদ পড়ো, কেননা এদিন উপস্থিতির দিন।ফেরেশতাগণ এদিনে উপস্থিত হন, আর তোমাদের কেউ যখনই আমার প্রতি দরূদ পড়ে, তখনই সেই দরূদ আমার নিকট পেশ করা হয়-এ পর্যন্ত যে, সে দরূদ পড়া থেকে ফারেগ হয়।” হযরত আবুদ দারদা’ (রা.) বলেন, আমি বললাম--(আপনার) ওফাতের পরও তা হবে? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন-“(আমার) ওফাতের পরও তা হবে ,কারণ আল্লাহ তা‘আলা যমিনের ওপর হারাম করেছেন যে, নবীগণের শরীর ভক্ষণ করবে। কাজেই নবীগণ জীবিত এবং রিযিকপ্রাপ্ত হন।”

(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১০৮৫)

অনুরূপভাবে সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসায়ী প্রভৃতিতে অপর রিওয়ায়াতে বিষয়টিকে আরো স্পষ্ট করে বর্ণনা করা হয়েছে--

হযরত আউস ইবনে আউস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন--“নিশ্চয়ই তোমাদের দিনসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম দিন হচ্ছে জুমু‘আর দিন। এদিনে হযরত আদম (আ.)কে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং এদিনে সিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে আর এদিনে সবাই সেই আওয়াজে বেহুঁশ হয়ে যাবে, সুতরাং এদিনে তোমরা আমার প্রতি বেশী করে দরূদ শরীফ পড়ো। কেননা, তোমাদের দরূদ আমার নিকট পৌঁছানো হবে। এ সময় জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করলেন--ইয়া রাসূলুল্লাহ! (আপনার ওফাতের পর) যখন আপনি মাটিতে গলে যাবেন, সে অবস্থায় আপনার নিকট কিভাবে আমাদের দরূদ পৌঁছানো হবে? তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করলেন-

-“নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা যমিনের ওপর হারাম করেছেন যে, নবীগণের শরীর ভক্ষণ করবে।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১০৪৮/ সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং ১৩৭৩/ ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১০৮৫ প্রভৃতি)

অপর হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) উম্মতের সালামের জাওয়াবও সঙ্গে সঙ্গে প্রদান করেন বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এ সম্পর্কে হযরত আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন--

“যে কেউ আমার প্রতি সালাম প্রেরণ করবে, আল্লাহ তা‘আলা আমার রূহ ফিরিয়ে দিবেন, তখন আমি তার সালামের উত্তর প্রদান করবো।”

(সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২০৪১/ বাইহাকী-সুনানে কুবরা, হাদীস নং ১০২৭০)

এক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট তাঁর রওজা মুবারকে দরূদ ও সালাম কী উপায়ে পৌঁছবে-এ সম্পর্কে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন--

“নিশ্চয় আল্লাহর অনেক বিচরণকারী ফেরেশতা রয়েছেন-যারা আমার নিকট আমার উম্মতের সালাম পৌঁছে দেন।”

(সুনানে নাসায়ী, ২য় খণ্ড, ২৪১ পৃষ্ঠা/ সহীহ ইবনে হাব্বান, হাদীস নং ৯১৪/ মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস নং ৪২১২)

যরত আলী (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন--

“আমার প্রতি দরূদ পড়ো। কেননা, তোমাদের দরূদ আমার নিকট পৌঁছে, তোমরা যেখানেই থাকো।”

(মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ, ২য় খণ্ড, ৩৭৫ পৃষ্ঠা/ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৮৫৮৬ / তাবরানী কাবীর, হাদীস নং ২৮২৯)

এ হাদীসসমূহ দ্বারা বুঝা গেলো--রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পরও তাঁর কবর মুবারকে তাঁর নিকট উম্মতের দুরূদ পৌঁছানো হয় এবং সেই দুরূদ তার কাছে আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের মাধ্যমে প্রেরণ করেন এবং তিনি উম্মতের সালামের জাওয়াবও প্রদান করেন। সেই সাথে এটাও জানা গেলো যে, তিনি কবরে অর্থাৎ আলমে বারযাখে জীবিত। তেমনিভাবে সকল নবীই করবে জীবিত আছেন এবং রিযিকপ্রাপ্ত হচ্ছেন।

=============================

***************************************

খেয়াল করুন :

=========

যে সকল আলিমগণ কবরে বা আলমে বারযাখে রসূল(সাঃ)এর জীবিত থাকার কথা বলছেন, এবং কবরের জীবনে বা আলমে বারযাখের জীবনে মৃত বা ঘুমন্ত অবস্থায় থাকার কথা বলছেন,আমি তাদের উভয়ের বক্তব্য এং তথ্য প্রমান পড়েছি। উভয়েই রসূল(সাঃ)এর ওফাত বিশ্বাস করেন। কিন্তু আলমে বারযাখে তার(সাঃ) অবস্থানটি নিয়েই মূলত এই মতদ্বৈততা।

এসকল আলিমগণ বলেননি যে রসূল(সাঃ) আলমে বারযাখ থেকে কারো কল্যান বা অকল্যান করতে পারেন বা সে ক্ষমতা তার আছে। এটা বিশ্বাস করলে সে শিরক করল। এক শ্রেণীর বিদয়াতী ও মাজার পূজারীরা রসূল(সাঃ)কে হাজির নাজির মনে করেন । কিন্তু এসকল আলিমগন সেটা থেকে মুক্ত। এটি হল হক বা তাহীদপন্থী আলিমদের মধ্যে দালিলিক মতদ্বৈততা,যা একান্তই ব্যাখ্যাগত। উভয়ের কাছেই কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক তথ্য প্রমান মজুদ রয়েছে।

উম্মাহর একত্রিত থাকার স্বার্থে কিছু বিষয়ে বিতর্ক এড়িয়ে চলাই উত্তম। যেসকল বিষয়ের প্রকৃত জ্ঞান মানুষের নেই, সেসব বিষয়ে বিতর্কে কল্যান নেই। তবে এই বিতর্ক থেকে জ্ঞানীরা উপকৃত হবে, তাদের সামনে বেশী বেশী কুরআন সুন্নাহর সূত্র প্রদর্শিত হবে এবং জ্ঞানীরা তার জ্ঞানের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে একাধিক বৈধ বিষয়ের ভেতর থেকে একটিকে সচেতনভাবে গ্রহন করতে সক্ষম হবে।

আমি এই লেখার মাধ্যমে বিতর্কের অবসান চেয়েছি,একইভাবে সত্য উপস্থাপন করতে চেয়েছি নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে। মূল বিষয় হল : রসূল(সাঃ) আল্লাহর একজন দাস কিন্তু রসূল হিসেবে বিশেষভাবে মনোনিত,সম্মানিত। আল্লাহ তাকে সম্মান প্রদান করেছেন বলেই তিনি সম্মানানিত হয়েছেন। তার কোনো ক্ষমতা নেই। সকল ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিপতি হলেন আল্লাহ। তিনি বারযাখের জীবনে যদি আল্লাহর দয়ায় ঘুমন্ত অবস্থায় বিশেষ নিয়ামত প্রাপ্ত হয়ে থাকেন, তাহলে যেমন আমাদের কোনো কল্যান করতে সক্ষম নন, ঠিক তেমনিভাবে সেখানে তিনি জীবিত থাকলেও আমাদের কোনো কল্যান করতে সক্ষম নন। এই বিষয়টি কুরআন সুন্নাহর দলিল অনুযায়ী মেনে নিলে বা মেনে না নিলে ঈমান চলে যাবার মত ঘটনা ঘটবে বলে মনে হয়নি। শুধুমাত্র হাশরের দিনে আল্লাহর বিশেষ অনুমতিতে তিনি(সাঃ) উম্মতের জন্যে সুপারিশ করতে পারবেন। এটিও ক্ষমতা নয়, বরং আল্লাহর দয়া বা সম্মান। এ বিষয়টি চিন্তায় রেখে যদি কেউ আলমে বারযাখে তার(সাঃ) জীবিত হওয়া অথবা ঘুমন্ত অবস্থায় থাকার ব্যাপারে কুরআন,সুন্নাহর দলিল অনুযায়ী যে কোনো একটিকে গ্রহন করে,তাহলে আল্লাহ এটিকে অনুমোদন করবেন বলেই আমার উপলব্ধী হয়েছে। কিন্তু যদি উম্মাহর ঐক্যের বিষয়টি বিবেচনায় না এনে এসকল বিষয়ে ঢালাও মন্তব্য ,বিতর্ক করা শুরু করে,তবে তাতে কোনো কল্যান আছে বলে আমার মনে হয় না, বরং সীমা লঙ্ঘনের মত পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন ! সঠিক জ্ঞান দান করুন এবং সর্বদা কল্যানের পথে পরিচালিত করুন !! 

Source: http://www.monitorbd.net/blog/blogdetail/detail/4370/theslave/65028#.VVMURaPLes4

Tuesday, May 5, 2015

তাক্বলীদ এবং কোন একটি মাযহাবের অনুসরণঃ বাড়াবাড়ি ও অবহেলার বিপরীতে মধ্যমপন্থী অবস্থান - ড. ইউসুফ আল ক্বারাদাওয়ী

ভাষাতাত্ত্বিক সংজ্ঞাঃ

আরব ভাষাবিদদের মতে, ‘তাক্বলীদ’ শব্দটি এর মূল ‘ক্বালাদা’ থেকে উৎসরিত হয়েছে। ‘ক্বালাদা’ অর্থ হচ্ছে এমন একটি হার যা শক্তভাবে গলায় বেঁধে দেয়া হয়। আর এখান থেকেই এসেছে কোন পথের ‘তাক্বলীদ’ করার ধারণা। ব্যাপারটি অনেকটা এরকম যেন কোন একজন অনুসারী নির্দিষ্ট একজন মুজতাহিদের কোন রায় বা সিদ্ধান্তকে হারের মতই গলায় শক্তভাবে বেঁধে রাখে।

শরঈ সংজ্ঞাঃ

তাক্বলীদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ইমাম শাওক্বানী তাঁর ‘সাইল আল জাররার’ গ্রন্থে বলেছেন তাক্বলীদ হল প্রমাণ ছাড়া অন্য একজনের কথা অনুযায়ী আমল করা।
এখানে উল্লেখযোগ্য যে, রাসূলের (সাঃ) হাদীসের উপর আমল করা, ইজমার উপর আমল করা, একজন মুফতীর মতানুযায়ী একজন সাধারণ মানুষের আমল করা, একজন বিচারক কর্তৃক নির্ভরযোগ্য সাক্ষীর সাক্ষ্য বিবেচনায় নেয়া তাক্বলীদের অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ, এগুলোর প্রামাণ্যতা ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর হাদীস এবং ইজমাকে যারা স্বীকার করে নেয় তাদের জন্য উভয়টিই স্পষ্টরূপে শরঈ বাধ্যবাধকতার উৎস। একজন সাধারণ মানুষের জন্য কোন মুফতীর রায় অনুযায়ী আমল করা ইজমা দ্বারা স্বীকৃত। আর একজন বিচারকের বিচার প্রক্রিয়ায় নির্ভরযোগ্য সাক্ষীর সাক্ষ্য গুরুত্বের সাথে নেওয়ার বিষয়টি কোরআন ও সুন্নাহতে সাক্ষী নেয়ার হুকুম এবং ইজমা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।
হাদীস বর্ণনাকারীদের বর্ণনা অনুসরণ করাও তাক্বলীদের গন্ডি বহির্ভূত কেননা হাদীসের শুদ্ধতা ও বৈধতা যাচাইয়ের পদ্ধতি (তাখরীজ) ইতিমধ্যেই সুপ্রতিষ্ঠিত। এছাড়া এগুলো কেবল হাদীস বর্ণনাকারীদের উক্তি নয় বরঞ্চ এ বর্ণনাসমূহ মুহাম্মাদ (সাঃ) এর সাথে সম্পর্কিত।

ইবনে আল হুমামের (মৃত্যু ৮৬১ হিজরী) ‘তাহরীর’ গ্রন্থে তাক্বলিদের আরো ভালো সংজ্ঞা পাওয়া যায়ঃ “তাক্বলীদ হচ্ছে শরঈ বাধ্যবাধকতার উৎস হিসেবে স্বীকৃত নয় এমন কারো কথার উপর প্রমাণ ছাড়া আমল করা।” আল কাফফালের (মৃত্যু ৩৬৫ হিজরী) মতে, “এটি (তাক্বলীদ) হচ্ছে কারো বক্তব্য (ফিক্বহী রায়) গ্রহণ করে নেয়া এটা না জেনেই যে তিনি তা কোথা থেকে পেয়েছেন।” শাইখ আবু হামিদ আল আসফারাইনি (মৃত্যু ৪০৬ হিজরী) এবং উস্তায আবু মানসুর আবদুল ক্বাহির আল বাগদাদী (মৃত্যু ৪২৯ হিজরী) উভয়ের মতে, “এটি (তাক্বলীদ) হচ্ছে শরঈ বাধ্যবাধকতার উৎস হিসেবে স্বীকৃত নয় এমন কারো ফিক্বহী রায়কে প্রমাণ ছাড়া গ্রহণ করে নেয়া।”

কোন মাযহাবের তাক্বলীদ করার উপর হুকুমঃ

তাক্বলীদের ব্যাপারে তিনটি মত পাওয়া যায়ঃ
১। যেকোন একটি মাযহাবের তাক্বলীদ বাধ্যতামূলক হওয়া
২। তাক্বলীদ নিষিদ্ধ এবং ইজতিহাদ বাধ্যতামূলক হওয়া
৩। যার ইজতিহাদ করার যোগ্যতা নেই তার জন্য তাক্বলীদ জায়েজ হওয়া

প্রথম মতঃ কোন একটি মাযহাবের তাক্বলীদ বাধ্যতামূলক হওয়া

প্রথম মত সাধারণ মানুষ-সুযোগ্য আলেম নির্বিশেষে সবার উপর তাক্বলীদ করাকে বাধতামূলক হিসেবে প্রতিপন্ন করে। এ মত অধুনা আলেমদের যেকোন ধরনের বা পর্যায়ের ইজতিহাদ করার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এ মতানুসারে ইজতিহাদ তাত্ত্বিকভাবে নিষিদ্ধ এবং প্রায়োগিক দিক থেকে অকার্যকর যার দরজা হিজরী তৃতীয় বা চতুর্থ শতক বা এর পূর্বেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে বলে ভাবা হয়।

এ মত অনুযায়ী চার মাযহাবের যেকোন একটির তাক্বলীদ করাকে প্রত্যেক মুসলিমের উপর ধর্মীয়ভাবে আবশ্যক গণ্য করা হয়। এ মতের অনুসারীগণ অধুনা আলেমদের তাদের নিজেদের অনুসৃত মাযহাবের বাইরে কোন মতকে প্রাধান্য দেয়ার অনুমতিও দেন না। চারটি জনপ্রিয় মাযহাবের বাইরে গিয়ে অন্য কোন মাযহাব বা মত (যদিও তা সাহাবা বা তাবেয়ীদের হয়) অনুসরণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

এ মতের অনুসারীগণ যদি বিদ্যমান মতসমূহের একটিকে আরেকটির উপর প্রাধান্য দেয়ার অনুমতি না দিয়ে থাকেন তবে তো তারা স্বাধীন ইজতিহাদের আরো বেশী বিরোধিতা করে থাকেন যদিও সেটি কিছু বিষয়ের উপর আংশিক ইজতিহাদ হয়ে থাকে। মানুষ জীবনের পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন চিন্তাধারা ও আদর্শের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও তারা স্বাধীন ইজতিহাদকে প্রত্যাখ্যান করেন। আর এসবই তাদের এই বিশ্বাস থেকে উদ্ভূত যে, ইজতিহাদের দরজা বন্ধ করে দিতে হবে।

পরবর্তী সময়ের কিছু আলেম চার মাযহাবের যেকোন একটি অনুসরণ করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেছেন। ইমাম আদ দারদিরের ফিক্বহের উপর গ্রন্থ ‘আশ শারহ আস সাগীর’ ও তাফসীর আল জালালাইন উভয়ের উপর হাশিয়ার রচয়িতা শাইখ আস সাওয়ী আল মালিকি (মৃত্যু ১২৬১ হিজরী) বলেনঃ “চার মাযহাবের বাইরে কোন মতের তাক্বলীদ করা জায়েজ নয় যদিও তা কোন সাহাবার কথা, সহীহ হাদীস ও কোরআনের আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় কেননা, যে চার মাযহাবের বাইরে অবস্থান করে সে নিজে পথভ্রষ্ট এবং অন্যকেও পথভ্রষ্ট করে। এটি কাউকে কুফরীর দিকেও নিয়ে যেতে পারে কারণ, কোরআন ও সুন্নাহতে যা ভাসাভাসাভাবে প্রতীয়মান হয় তা থেকে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কুফরীর ভিত্তিতেই গ্রহণ করার নামান্তর।”

আশ-শাওক্বানীর সমসাময়িক এই শাইখের কঠোরতার দিকে লক্ষ্য করুন! দুজনের মতের বৈপরীত্যের দিকেও খেয়াল করুন। তিনি চার মাযহাবের বাইরে কিছুর তাক্বলীদ করতে নিষেধ করেন যদিও তা সাহাবার কোন কথার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়। এর চেয়েও নিকৃষ্ট ব্যাপার এই যে, সহীহ হাদীসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও সেটার তাক্বলীদ নিষিদ্ধ এমনকি কোরআনের সাথে হলেও।

আরেকটি বাড়াবাড়ি হচ্ছে, চার মাযহাবের বাইরে অবস্থানকারী (এমনকি তা কেবলমাত্র কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ক্ষেত্রে হলেও) কাউকে পথভ্রষ্ট ও পথভ্রষ্টকারী মনে করা এবং সেটা কুফরের দিকে নিয়ে যেতে পারে এমনটা ভাবা। এসবই হঠকারিতা এবং তা ইজতিহাদী আলেমদের ঐক্যমতের বিরুদ্ধে যায়।

তাক্বলীদ করা আবশ্যক এ মতটি পরবর্তী শতাব্দীতে ধর্মীয় স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গৃহীত হয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সালাফ (প্রথম প্রজন্মের) আলেমরা এই রেওয়াজকে খালাফদের (পরবর্তী প্রজন্মের আলেমদের) কাছে পৌঁছে দেন যারা আবার তাদের ছাত্রদের মনে বদ্ধমূল করে দেন যেঃ “যে ব্যক্তি কোন আলেমের তাক্বলীদ করে, সে সালেম (নিরাপদ) অবস্থায় আল্লাহর সাথে মিলিত হয়।”

আমার মনে আছে, আল আযহারের উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে উলুমুত তাওহীদ ক্লাসে আমি এটি শিখেছিলাম। আমাকে আল ক্বারনীর জাওহারাহ এবং আল বাজুরী কর্তৃক এর ব্যাখ্যা পড়তে হয়েছিল। সেখানে লেখক বলেন,

“মালিক এবং বাকি ইমামগণের
যেমনটি আবুল কাসিমের মত উম্মাহর পথপ্রদর্শক বলেন,
জ্ঞানীদেরও যেকোন একজনের তাক্বলীদ করা প্রয়োজন
কেননা মানুষ যে শব্দ বুঝে তাতেই বর্ণনা করে”

আবুল কাসিম বলতে এ ছত্রে বিখ্যাত সূফী আল জুনাইদ ইবনে মুহাম্মাদকে (মৃত্যু ২৯৭ হিজরী) বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ তাঁর উপর রহমত বর্ষণ করুক। এটি এদিকেই ইঙ্গিত করে যে, ফিক্বহের চার মাযহাবের ইমামগণের মধ্যে যেকোন একজনের তাক্বলীদ করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর বাধ্যতামূলক।

এখানে ইমাম মালিককে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কারণ লেখক একজন মালিকী। লেখকের মতে, তারবিয়্যাতের (আত্মশুদ্ধি) ক্ষেত্রে যেমনটি সূফী ইমামদের অনুসরণ করা হয়, ঠিক তেমনিভাবে ফিক্বহের ইমামদেরকেও অনুসরণ করতে হবে। আলেমদের প্রতি জুনাইদ এমনই পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন – তরীক্বার (পদ্ধতি) নিষ্ঠা, তাঁর দিক-নির্দেশনার গভীরতা, চরমপন্থা ও বিদা’আত থেকে তাঁর সুদূর অবস্থান।

কিছু আলেম আবার আক্বীদার ব্যাপারেও আবুল হাসান আল আশ’আরী বা আবুল মানসুর আল মাতুরিদীর মত সুপরিচিত যেকোন ইমামের অনুসরণ করার কথা বলেন।

মাগরেবে (লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো, মৌরিতানিয়া) আমাদের ইলমী ভাই এবং যায়তুনা, কায়রাওয়ান ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বহুল প্রচলিত প্রথা হচ্ছে আক্বীদায় আশ’আরী মাযহাব, ফিক্বহে মালিকী মাযহাব ও আদাবের ক্ষেত্রে জুনাইদের মাযহাব বা সূফী তরীক্বা অনুসরণ করা। আল্লাহ তাঁদের সবার উপর সন্তুষ্ট হন।

এ মতের খুঁটিনাটি ও সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতা সংক্ষেপে নিম্নরূপঃ

১। সবার উপর এমনকি আলেমদের উপরও তাক্বলীদ আবশ্যক হওয়া
২। কেবলমাত্র চার মাযহাবের ইমামদের তাক্বলীদ বাধ্যতামূলক হওয়া। চার মাযহাবের বাইরে অন্য কোন ফিক্বহী রায় গ্রহণ করা নিষিদ্ধ হওয়া।
৩। এই চার ইমামের মধ্যে কেবলমাত্র যেকোন একজনের তাক্বলীদ বাধ্যতামূলক হওয়া। তাই এই চার মাযহাবের মধ্যে কোন একটি মাযহাবের কিছু মত সুস্পষ্টভাবে দুর্বল প্রতিপন্ন হওয়া সত্ত্বেও চার মাজহাবেরই অন্য কোন একটি মাযহাব থেকে মত গ্রহণ করা জায়েজ না হওয়া।
৪। ইজতিহাদের দরজা বন্ধ রাখা এবং ইজতিহাদের দিকে আহবানের পথ রুখে দাঁড়ানো যদিও তা আংশিক ইজতিহাদ হয়।
৫। নিজের মাযহাবকে অন্য মাযহাব থেকে উত্তম মনে করা আর এভাবে গোষ্ঠীকেন্দ্রিক মনমানসিকতার কাঠামোতে আটকে যাওয়া।

তাক্বলিদের প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গীকে অনেক আলেম খন্ডন করেছেন যেমনঃ ইবনে আবদুল বার, ইবনে হাযম, ইবনে তাইমিয়া, ইবনিল ক্বায়্যিম, আস-সান’আনি, আশ-শাওক্বানী, আদ দেহলভী প্রমুখ।

দ্বিতীয় মতঃ তাক্বলীদ নিষিদ্ধ এবং ইজতিহাদ বাধ্যতামূলক

দ্বিতীয় মতটি প্রথম মতের ঠিক উল্টোঃ সকলের জন্য তাক্বলীদ নিষিদ্ধ এবং ইজতিহাদ করা বাধ্যতামূলক। এ মতের অনুসারীগণ প্রত্যেক মুসলিমের উপর সরাসরি কোরআন ও সুন্নাহ থেকে ফিক্বহী রায় গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক মনে করেন। তাঁরা অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে চার মাযহাবের অনুসরণকে বাতিল গণ্য করেন এবং যারা চার মাযহাব অনুসরণ করার পক্ষে তাদেরকেও প্রচন্ডভাবে আক্রমণ করেন। সম্ভবত তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ তাক্বলীদের উপর আক্রমণ করার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে থাকেন যেহেতু তাঁরা মাযহাবগুলোকেই আক্রমণ করে থাকেন। কেউ কেউ আবার আগ বাড়িয়ে মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতাদেরকেই আক্রমণ করে বসে থাকেন।

ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি যে, এ মতের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রস্তাবক হচ্ছেন বিখ্যাত যাহেরী ফক্বীহ আবু মুহাম্মাদ ইবনে হাযম। তিনি ফিক্বহের উসূলী মূলনীতির উপর ‘আল ইহকাম ফি উসূল আল-আহকাম’, তুলনামূলক ফিক্বহের উপর ‘আল মুহাল্লা’, বিভিন্ন ধর্ম ও ধর্মীয় ফেরকার ইতিহাসের উপর ‘আল ফাসল ফিল মিলাল ওয়ান নিহাল’ সহ বহু গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন।

পরবর্তী সময়ের আরেকজন বিখ্যাত আলেম ইমাম শাওক্বানী তাঁর ‘ইরশাদ আল ফুহুল’, ‘আস সাইল আল জাররার’ এবং তাঁর রিসালা ‘আল ক্বাওল আল মুফিদ ফিল ইজতিহাদ ওয়াত তাক্বলীদ’ সহ অনেক লেখনীতে এ মতের প্রচার ও প্রসার করেছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে তাক্বলীদের ধারণাকে প্রত্যাখান করেন যদিও তা ইবনে হাযমের তুলনায় কম আক্রামণাত্মক ছিল।

আমাদের সময়ে আহলে হাদীসদের থেকে একটি দল এ মতের সমর্থক যাদের সম্মুখভাগে রয়েছেন শাইখ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী ও তাঁর অনুসারীগণ।

এই মতানুসারীদের প্রতিপক্ষগণ তাঁদের নাম দিয়েছেন ‘আল লা-মাযহাবিয়্যুন’ তথা লা-মাযহাবী, কেননা এ মতের অনুসারীগণ আলেম-সাধারণ মানুষ নির্বিশেষে সবার জন্য কোন মাযহাব অনুসরণের বিরোধিতা করে থাকেন। এ মতের প্রতিপক্ষগণ বহু প্রবন্ধ ও গ্রন্থের মাধ্যমে এই মতের খন্ডন করেছেন। উদাহরণস্বরূপ তুরস্কের বিখ্যাত আলেম মুহাম্মাদ যাহিদ আল কাওছারীর প্রবন্ধ ‘আল লা মাযহাবিয়া ক্বেনতারা ইল্লা আল-লা দ্বীনিয়্যাহ’, হামাওয়ী আলেম শাইখ মুহাম্মাদ আল হামিদের লেখা ও শাইখ মুহাম্মাদ সাঈদ রামাদান আল বুতীর বই ‘আল লা মাযহাবিয়াহ আখতার বিদা’আহ তাহাদ্দাছ আশ-শারীয়াহ আল ইসলামিয়্যাহ’ প্রভৃতির কথা বলা যেতে পারে।

এই আরেকটি প্রান্তিক মতের খুঁটিনাটি ও সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতাগুলো সংক্ষেপে নিম্নরূপঃ

১। সবার জন্য তাক্বলীদ নিষিদ্ধ এমনকি সাধারণ মানুষের জন্যও যাদের কাছে ইজতিহাদের কোন জ্ঞান নেই।
২। তরুণদের এমন প্রাচুর্য (যারা জ্ঞানে ভাসা ভাসা এবং আচরণে রুক্ষ) যারা মুজতাহিদের পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার দাবী করে থাকে।
৩। তরুণদের দ্বারা পূর্বযুগের বিখ্যাত আলেম ও মুজতাহিদগণকে বাতিল বলে গণ্য করার ধৃষ্টতা।
৪। উম্মাহর ফিক্বহী মাযহাবগুলোর প্রতি অবজ্ঞাভাব যদিও এই মাযহাবগুলো প্রচুর পরিমাণ উপকারী জ্ঞানের উৎস।
৫। এ মতের কিছু কিছু অনুসারীদের মাযহাবসমূহ এবং এগুলোর ইমামদের নিন্দায় সীমা অতিক্রম করা।
৬। এ মতের অনুসারীদের মধ্যে যাহেরী (আক্ষরিক) ধারা এমনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যে কেউ কেউ তাদের ‘নব্য-যাহেরী’ হিসেবেও নামকরণ করেছেন।
৭। ফিক্বহের ছোটখাটো মতপার্থক্য নিয়ে উম্মাহর তর্কে-বিতর্কে লিপ্ত থাকা যা অনেক অন্তর্বিরোধের জন্ম দিয়েছে।
৮। এ মতের অনুসারীগণ তাদের সাথে মতভিন্নতা পোষণকারীদের বাতিল হিসেবে গণ্য করে। তারা এ দাবী করে যে, একমাত্র তারাই কোরআন ও সুন্নাহর যথার্থ অনুসরণ করে থাকে।

ইমাম আশ-শাওক্বানী এবং তাক্বলীদঃ

ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আলী আশ শাওক্বানী (মৃত্যু ১২৫০ হিজরী) ছিলেন হিজরী ত্রয়োদশ শতাব্দীতে পুনর্জাগরণ এবং ইজতিহাদের প্রাণপুরুষ যা তাঁর ইজতিহাদের উপর লেখা গ্রন্থসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয়। উদাহরণস্বরূপ, তাঁর ‘আস সাইল আল জাররার’ গ্রন্থটির কথা বলা যেতে পারে যা ‘আল আযহার’ (যায়েদী বা হাদুয়ী ফিক্বহের মৌলিক বই) বইয়ের ব্যাখ্যা যেখানে তিনি স্বাধীন ইজতিহাদের পথে হেঁটেছেন। তিনি কোরআন ও সুন্নাহর উপর ভিত্তি করে নিজের ফিক্বহী রায় ব্যক্ত করেন যেগুলো তাঁর সময়কার চার অথবা আট মাযহাবের পরিধির বাইরে ছিল। আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে তাঁর ‘নাইলুল আওতার’ গ্রন্থটি যেখানে তিনি ইবনে তাইমিয়াহর ‘মুনতাক্বাল আখবার মিন আহাদীস সায়্যিদ আল আখবার’ গ্রন্থের ব্যাখ্যা করেছেন। এ বইটি সুন্নী এবং অসুন্নী উভয় মাযহাবের জন্য আধুনিক ফিক্বহের উপর গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পদে পরিণত হয়েছে। আরেকটি উদাহারণ হচ্ছে তাঁর গ্রন্থ ‘আল দারারী আল মুদিয়্যাহ’ (‘আল দুরার আল বাহিয়্যাহ’ গ্রন্থের ব্যাখ্যা) যেখানে তিনি তাঁর স্বাধীন ফিক্বহের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন।

প্রকৃতপক্ষে ইমাম শাওক্বানী তাঁর একের বেশী গ্রন্থে তাক্বলীদের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং স্বাধীন ইজতিহাদের দিকে আহবান করেন। এগুলো হচ্ছেঃ

১। ফিক্বহের উসূলী মূলনীতির উপর তাঁর বিখ্যাত বই ‘ইরশাদ আল ফুহুল’
২। তাঁর বিখ্যাত রিসালাহ ‘আল ক্বাওল আল মুফিদ ফি আদিল্লাতিল ইজতিহাদ ওয়াত তাক্বলীদ’
৩। তাঁর বই ‘আদাব আল তালিব ওয়া মুনতাহা’ল আরাব’
৪। তাঁর সুবিস্তারিত বই ‘আল সাইল আল জাররার’

তাক্বলীদের সমর্থকগণ তাক্বলীদের সমর্থনে যেসব দলিল পেশ করেন আশ শাওক্বানী এর ভিন্ন ব্যাখ্যা দান করেন যেসব দলিলের মধ্যে রয়েছে কোরআনের আয়াতঃ “তোমরা যদি না জেনে থাকো তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস কর।” (১৬:৪৩) আর রাসূলের (সাঃ) হাদীছঃ “তারা যদি না জেনে থাকে তবে কি তারা জিজ্ঞাসা করে না? ভ্রান্তির প্রতিষেধক হচ্ছে জিজ্ঞাসা করা”। আশ শাওক্বানী এটা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন যে, এসব দলিল সব বিষয়ে কেবল একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির তাক্বলীদ করার কথা বলে না বরং জ্ঞানীদের মধ্যে যার কাছেই যাওয়ার সুযোগ আছে তাকেই জিজ্ঞাসা করার দিকে ইঙ্গিত করে। এটাই নবী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবীদের সময়ের চর্চা ছিল।

আশ-শাওক্বানী ইবনিল কায়্যিম, ইমাম ইবনি আবদিল বার, ইবনে হাযম এবং তাঁর আগের অন্যান্য আলেমদের লেখা থেকে উপকৃত হন যারা তাক্বলীদকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে এ ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং একে নিন্দনীয় বিদা’আত হিসেবে গণ্য করেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন, আল্লাহর নেয়ামত সুবিস্তৃত এবং এ নেয়ামতকে কোন নির্দিষ্ট যুগের মধ্যে আবদ্ধ করা যায় না বা নির্দিষ্ট এক দল মানুষও এর একচেটিয়া অধিকারী নয়। বরং আল্লাহ যাদেরকেই এ যোগ্যতা দান করেছেন তাদের সবার জন্য এটি উন্মুক্ত।


আশ-শাওক্বানী ইজতিহাদের ডাক দেন এবং নিজেও পুরোপুরিভাবে স্বাধীন ইজতিহাদের চর্চা করেন। তিনি সুপরিচিত কোন মাযহাবেরই অনুসরণ করেন নি – না ফিক্বহের উসূলী মূলনীতিতে না মূল ফিক্বহে – যদিও তিনি শুরুতে ছিলেন একজন যায়েদী। তিনি এমনকি তাঁর নিজের ফিক্বহী মূলনীতি প্রণয়ন করেন যা তিনি ‘ইরশাদ আল ফুহুল ইলা তাহক্বীক আল হাক্ব মিন আল ইলমি আল উসূল’ গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেন।

তিনি ফিক্বহের ক্ষেত্রে স্বাধীন আইনী যুক্তিতর্ক (legal reasoning) এবং মতের (রায়) ব্যবহারের বিরোধিতা করেন এবং আহলুর রায় এর ফিক্বাহকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। এর পরিবর্তে তিনি পরিপূর্ণভাবে ওহীর উপর নির্ভরতার ব্যাপারে জোর দেন এই ভিত্তিতে যে দ্বীন ইমামদের মতের ভিত্তিতে নির্মিত হয়নি বরং এটি দ্বীনের মোহর (Seal of the Religion) আল্লাহর রাসূল (সা) এর বর্ণনার ভিত্তিতেই গঠিত। তিনি বিশ্বাস করতেন যে একজন সাধারণ মানুষ যে ইজতিহাদ করার যোগ্যতা রাখে না তাকে অবশ্যই আলেমদের শরণাপন্ন হতে হবে যারা কোরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে নিজেদের অবস্থান ব্যক্ত করবেন, নিজেদের মতের ভিত্তিতে নয়।

আমি শাওক্বানীর সাথে কিছু ব্যাপারে একমত আর কিছু ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করি। যে সব বিষয়ে আমি তাঁর সাথে একমত পোষণ করি সেগুলো হচ্ছেঃ

১। আলেমদের প্রতি তাঁর স্বাধীন ইজতিহাদের আহবান
২। উম্মাহর সকলের উপর যারা তাক্বলীদ চাপিয়ে দিতে চান তাদের প্রত্যাখ্যান করা
৩। যারা প্রত্যেকটি বিষয়েই যেকোন একটি মাযহাবের গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকাকে প্রয়োজনীয় মনে করে তাদের বিরোধিতা করা
৪। তাদের বিরোধিতা করা যারা কেবলমাত্র একটি নির্দিষ্ট মাযহাবকে কঠোরভাবে অনুসরণ করেন এমনকি সে মাযহাবের কিছু বিষয়ের ক্ষেত্রে ঐ মাযহাবের উৎসসমূহের দুর্বলতা তাদের সামনে পরিস্কারভাবে তুলে ধরার পরেও
৫। দ্বিতীয় বা তৃতীয় হিজরী শতাব্দীর পর ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে এমন ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করা
৬। মানুষের মতের উপর কোরআন ও সুন্নাহকে প্রাধান্য দেয়ার জন্য উম্মাহ্‌র প্রতি তাঁর আহবান

যাহোক, সাধারণ মানুষের উপর তাক্বলীদ ও যেকোন একটি মাযহাব অনুসরণ করার উপর তাঁর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যাপারে আমার দ্বিমত রয়েছে।
সাধারণ মানুষের আবু হানিফা, মালিক, শাফিঈ, আহমেদ, যাইদ, আল হাদি, জাফর, জাবির এবং অন্যান্য যেকোন একজন ইমামকে অনুসরণ করা ও তাঁর মাযহাব আঁকড়ে ধরার ব্যাপারে আমি কোন সমস্যা দেখি না। শরীয়াহ অনুসারে তা বৈধ কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়। সাধারণ মানুষের কোন মাযহাব নেই- এ মতটিই অগ্রাধিকার পায়। বরং আলেমদের মধ্য থেকে যার কাছ থেকে সে জিজ্ঞাসা করছে সে আলেমের মাযহাবই তার মাযহাব। এভাবে সে তার মাযহাব থেকে অন্য মাযহাবে যেতে পারে এবং আলেমদের মধ্যে থেকে যাকে ইচ্ছা তাকেই যেকোন প্রয়োজনীয় বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতে পারে। এমনকি সে ক্ষেত্রবিশেষে নিজের মাযহাব ছেড়ে অন্য মাযহাবও অনুসরণ করতে পারে যদি সে বিশ্বাস করে অন্য মাযহাবের আরো শক্ত দলিল রয়েছে


ফিক্বহে স্বাধীন আইনী যুক্তিতর্ক (legal reasoning) এবং মত (রায়) ব্যবহারকে শারীয়াহ বিরোধী প্রতিপন্ন করে ইমাম শাওক্বানী যে অবস্থান নিয়েছেন সে ব্যাপারেও আমার দ্বিমত রয়েছে। প্রকৃত বাস্তবতা এটাই যে, মত বা রায় ছাড়া কোন ফিক্বহ নেই। নিন্দনীয় রায় হচ্ছে সেটিই যা সুস্পষ্টভাবে নুসুসের (কোরআন ও সুন্নাহ) বিরুদ্ধে যায়। কিন্তু যে সকল বিষয়ে নুসুসের কোন বক্তব্য নেই সে সকল বিষয় বুঝতে এবং নুসুসকে এর বুনিয়াদী ভিত্তি ও মাক্বাসিদ আশ-শারীয়াহর আলোকে অনুধাবন করতে রায় অপরিহার্য। এছাড়াও রায় আবশ্যক যেখানে আইনী প্রশস্ততা বিদ্যমান থাকার দরুণ কিছু নির্দিষ্ট বিষয় এড়িয়ে যাওয়া যায় অথবা যেসব বিষয়ে অবশ্য পালনীয় এমন পরিষ্কার নির্দেশনামূলক (কাতঈ) আয়াত ও হাদীস বিদ্যমান নেই। আর এই রায় গঠিত হয় নিম্নরূপেঃ

১। কোরআন-সুন্নাহর ভিত্তি করে ক্বিয়াসের (সাদৃশ্যতার উপর ভিত্তি করে যুক্তিতর্কের একটি পদ্ধতি) মাধ্যমে অথবা
২। ইসতিহসানের (আইনী অগ্রাধিকার) মাধ্যমে যা হচ্ছে একটি শক্তিশালী কিন্তু অস্পষ্ট ক্বিয়াসের জন্য দুর্বল কিন্তু স্পষ্ট ক্বিয়াসকে এড়িয়ে যাওয়া অথবা
৩। ইসতিসলাহের (বৃহত্তর কল্যাণের খোঁজ করা) মাধ্যমে যা হচ্ছে আইনী শর্তসমূহ মাথায় রেখে সার্বজনীন কল্যাণের জন্য কাজ করা বা
৪। ‘উরফের (প্রচলিত প্রথা) মাধ্যমে, একে নিজের স্থানে রেখে অথবা
৫। সাদ আল-জারাঈ (খারাপের দিকে ধাবিত করে এমন পথ রুদ্ধ করা) অথবা
৬। ইসতিসহাবের মাধ্যমে (ধারবাহিকতার অনুমতি) ইত্যাদি।

এ সবগুলোর প্রয়োগে রায়ের ব্যবহার জড়িত। ফক্বীহগণ কি আসলেই এটি ব্যবহারের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন? একইভাবে উমর, উসমান, আলী, ইবনে মাস’উদ, যায়েদ, ইবনে আব্বাস এবং অন্যান্যদের ফিক্বহ কি রায় থেকে মুক্ত?

এমনকি রায় ছাড়া কি কোরআন-সুন্নাহ সঠিকভাবে বোঝা সম্ভব? রাসূল (সাঃ) এর সাহাবীরা বনু কুরাইজার পথে আসরের সালাত আদায় করার সময় কি রায়ের ব্যবহার করেন নি? ইবনে তাইমিয়্যাহ এর মতে, তারা তাদের চাইতে বেশী সঠিক ছিলেন যারা সালাতের সময় অতিক্রম হয়ে যাওয়ার পর গন্তব্যে পৌঁছে সালাত আদায় করেছিলেন।

মাক্বাসিদ আস শারীয়াহ কি কোরআন-সুন্নাহ বোঝার ক্ষেত্রে রায় ব্যবহারের উদাহারণ নয়?

দুর্ভিক্ষের সময় উমর (রাঃ) কর্তৃক চুরির হদ্দের সাময়িক রহিতকরণ কি রায়ের উদাহরণ নয়? রক্তপণের দায়িত্ব গোত্র থেকে রাষ্ট্রের উপর স্থানান্তরের তাঁর যে সিদ্ধান্ত তা কি রায়ের উদাহরণ নয়? ইরাকের কিছু বিজিত এলাকা মুসলিম সেনাবাহিনীর মধ্যে বন্টন করার বিরুদ্ধে উমরের সিদ্ধান্ত কি রায়ের নমুনা নয়? মুসলিম নারীদের উপর প্রভাবের ভয়ে তাঁর কর্তৃক আহলে কিতাবের নারীদের বিয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা কি রায় ছিল না? বিপরীতমুখী সিদ্ধান্ত দেয়ার পরও উত্তরাধিকার আইনে আপন ভাইদের সাথে মায়ের দিক থেকে সৎ ভাইদের অন্তর্ভুক্তিকরণ কি রায়ের একটি নমুনা ছিল না?২

স্বামীর মৃতপ্রায় মুমূর্ষ অবস্থায় দেয়া তালাক কার্যকর হয় না- উছমান (রাঃ) এর এই মত কি রায়ের উদাহারণ ছিল না?৩ এ বর্ণনা কি পাওয়া যায় না যে, আবু বকর ও অন্যান্য সাহাবীরা বলতেন, “আমি আমার রায় দ্বারা ফতোয়া দেই। যদি তা সঠিক হয় তবে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর যদি তা ভুল হয় তবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সকল ত্রুটির ঊর্ধ্বে।”

আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কি মুয়াযকে (রাঃ) ইয়েমেনে পাঠানোর সময় তাঁর জবাব গ্রহণ করেন নি? তিনি (সাঃ) তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, “তুমি কি দ্বারা বিচারকর্ম সম্পাদন করবে?” মুয়ায (রাঃ) জবাব দিলেন যে, তিনি আল্লাহর কিতাব দ্বারা বিচার করবেন, অতপর রাসূল (সাঃ) এর সুন্নাহ দ্বারা বিচার করবেন। যদি আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহতে সমাধান পাওয়া না যায় সেক্ষেত্রে তিনি বলেন, “আমি আমার রায় দ্বারা ইজতিহাদ করবো।”

সাহাবারা কি নিজেদের রায় এবং বোঝাপড়ার ভিন্নতার কারণে কিছু কিছু বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেন নি?

তৃতীয় মতঃ যারা ইজতিহাদ করার যোগ্যতায় পৌঁছেনি তাদের জন্য তাক্বলীদের অনুমতি দেয়া

এই মতটি এর অনুসারীদের উপর প্রথম মতের মত তাক্বলীদ চাপিয়ে দেয় না আবার দ্বিতীয় মতের মত একে নিষিদ্ধও গণ্য করে না। বরং, এটি কারো কারো জন্য তাক্বলীদের অনুমতি দেয় এবং অন্যদের জন্য তা নিষিদ্ধ করে। ইমাম হাসান আল বান্না এ বিষয়টি তাঁর ‘বিশটি মূলনীতি’ প্রবন্ধের একটি মূলনীতির আলোচনায় আলোকপাত করেছেনঃ

“ফিক্বহ ও ফিক্বহী রায় আহরণ করার পেছনের যুক্তি বোঝার যোগ্যতা অর্জন করে নি এমন প্রত্যেক মুসলিমের উচিত ইসলামী ফিক্বহের মহান ইমামদের অনুসরণ করা। একজন ইমামকে অনুসরণ করার সময় তাঁর যুক্তিতর্ককে বোঝার চেষ্টা করা উচিত। একবার যখন সে ইমামের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে, তখন সে ইমামের যথার্থ যুক্তির ভিত্তিতে দেওয়া যেকোন পথনির্দেশ মেনে চলা উচিত। একইসাথে একজন মুসলিমের উচিত ফিক্বহ ও ফতোয়া আহরণের যুক্তিতর্ক বোঝার পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য দরকারী চেষ্টাসাধনা করা।”
এভাবে হাসান আল বান্না তাক্বলীদ বা মাযহাবের অনুসরণকে বাধ্যতামূলক করেন নি আবার একে নিষিদ্ধও করেন নি। বরঞ্চ তিনি এর অনুমতি দিয়েছেন কিন্তু তা সবার জন্য নয়। এটি বৈধ “এমন সব মুসলিমদের জন্য যারা ফিক্বহী রায় আহরণ করার পর্যায়ে পৌঁছে নি” তথা সাধারণ মানুষ এবং তাদের মত লোকদের জন্য যারা কোরআন ও সুন্নাহ থেকে হুকুম আহরণের যোগ্য নয় অথবা ইজমা, ক্বিয়াস এবং মৌলিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য পদ্ধতি যেমন ইসতিসলাহ, উরফ, ইসতিসহাব ও পূর্ববতী সময়ের শরীয়াহ এসব সম্পর্কে জানার যোগ্যতা রাখে না।
অনুসরণ (ইত্তেবা) বনাম অন্ধ অনুকরণ (তাক্বলীদ)

উস্তায হাসান আল বান্না প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে তাঁর “মূলনীতি” প্রবন্ধে ‘তাক্বলীদ’ শব্দটির জায়গায় ‘ইত্তিবা’ শব্দটির প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, “মুসলিমরা ফিক্বহের মহান ইমামদের যেকোন একজনকে অনুসরণ (ইয়াত্তাবি’উ) করবে।” কোরআনও নানা প্রসঙ্গে ‘ইত্তিবা’ শব্দটি ব্যবহার করেছে যা একে প্রশংসনীয় ও আইনগতভাবে বৈধ করে তুলেছে।

এটি ইব্রাহীম (আঃ) এর উদ্ধৃতিতেও দেখা যায়ঃ “হে আমার পিতা, নিশ্চয়ই আমার কাছে এমন জ্ঞান এসেছে যা আপনার কাছে আসে নি। অতএব আমাকে অনুসরণ করুন। আমি আপনাকে সোজাপথের দিকে ধাবিত করবো।” (কোরআন ১৯:৪৩)। এই আয়াত কোন নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে জ্ঞানহীন একজনকে আহবান করছে অন্য এমন একজনকে অনুসরণ করতে যে ঐ বিষয়ে জ্ঞানী।

আমরা মূসা (আঃ) এবং আল্লাহর বিখ্যাত সৎকর্মশীল বান্দা খিযির এর কাহিনীতেও দেখিঃ “তাঁরা আমার বান্দাদের মধ্য থেকে একজনকে খুঁজে পেল যাঁকে আমি নিজের অনুগ্রহ দান করেছিলাম এবং নিজের পক্ষ থেকে বিশেষ জ্ঞান দান করেছিলাম। মূসা তাঁকে বলল, “আমি কি আপনাকে অনুসরণ করতে পারি যাতে আপনাকে হিদায়াতের যা কিছু শেখানো হয়েছে তা থেকে আমাকেও কিছু শেখাবেন?” (কোরআন ১৮:৬৫-৬৬)

মূসা (আঃ) খিযিরকে অনুসরণ করার (ইত্তিবা’ইহি) অনুমতি চাইলেন যাতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁকে যে জ্ঞান দিয়েছেন তা থেকে শিখতে পারেন। এটা প্রমাণ করে, ক্ষেত্র বিশেষে জ্ঞানীকে অনুসরণ করা নিন্দনীয় নয়।

ইমাম আবু উমার ইবনে আবদুল বার বলেন, “জ্ঞানের উদ্দেশ্য হচ্ছে পরিষ্কার ধারণা অর্জন; কোন জিনিসকে এর প্রকৃতরূপে অনুধাবন করা। যখন কোন জিনিসকে কারো সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়, সে তা জানতে পারে। আলেমরা বলেন, যারা তাক্বলীদ করে তাদের কোন জ্ঞান নেই এবং এ বিষয়ে তাঁদের মধ্যে কোন মতপার্থক্য নেই।”

আবু আবদুল্লাহ বিন খুয়াইজ মিনদাদ আল বাসরী আল মালিকী বলেন, “তাক্বলীদ হচ্ছে এমন কোন মতকে অনুসরণ করা যা কোন দলিল দ্বারা সমর্থিত নয়। কিন্তু ইত্তিবা’ শব্দটি ইঙ্গিত করে যে এই মতটি আইনী ন্যায্যতার ভিত্তিতে গৃহীত। দ্বীনে ইত্তিবা অনুমোদিত কিন্তু তাক্বলীদ অনুমোদিত নয়।”

তথ্যসূত্রঃ

১। প্রবন্ধটি মূলত ‘কাইফা নাতা’আমাল মা’আত তুরাছ ওয়াল তামাযুব ওয়াল ইখতিলাফ’ গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে (পৃষ্ঠা ৬২-৭৩)
২। এটি ইসলামী উত্তরাধিকারী আইনের একটি বিশেষ পরিস্থিতি (আল মাসলাহা আল হিমারিয়াহ)
৩। এটিকে তালাক্ব আল ফার্‌ (এড়ানোর জন্য তালাক্ব) বলে যেখানে কেউ স্বীয় উত্তরাধিকার থেকে তার স্ত্রীর অংশ লাভের সম্ভাবনাকে এড়িয়ে যেতে চায়।

সোর্স - ইসলামী স্কলার ও অন্যান্ন জ্ঞানের শাখায় বিশেষজ্ঞদের লেখার অনুবাদ ভিত্তিক অনলাইন সাইট সঞ্চারণ।

http://shoncharon.com/